রথের মেলা

উৎসব-সংস্কৃতি

কাবেরী তালুকদার: খুব ছোট থেকেই আমি কৃষ্ণ জিউর মন্দিরে রথ যাত্রায় যেতাম। এই মন্দিরের গঠন সৈলীটা অপূর্ব।
এমন মন্দির ভারতবর্ষের আর কোথাও দেখিনি। জায়গাটা হচ্ছে কাচরাপাড়া দিয়ে গেলে স্টেসনে নেমে 27 নম্বর বাস ধরে বলতে হবে বুদ্ধ পার্কের আগের স্টপেজ রথতলা। আর কল‍্যানী দিয়ে গেলে বুদ্ধ পার্কের পরের স্টপেজ। দুটোই 27 নম্বর বাস। নেমেই বা দিকে পরবে এই মন্দির। ছরানো ছিটানো মেলা।

ছোটবেলায় মন্দিরের দিকে বা বিগ্রহের দিকে কোন নজর দিতাম না।মূল আকর্ষন ছিলো মেলা।
এখানে আবার কবি ঈশ্বর গুপ্তের আদি বাড়ি। জায়গাটার নাম গ্রাম কাচরাপাড়া। মন্দির টি অনেকটা পিরামিডের মতন। চার দিকে চারটি ত্রিভূজ প্রায় তিরিশ ফুট উপরে একটা বিন্দু তে মিলেছে ত্রিভূজ চারটি।

পুরোনো ছোটো টালির উপর টেরা কোটার কাজ।একটু মনদিয়ে দেখলে প্রতিটি ওয়ালে এক একটি পৌরানিক গল্প পাওয়া যাবে। তার পরেই চারফুট চ ওড়া বারান্দা। এবং প্রত‍্যেক দিকেই শিড়ি আছে নিচে নামার জন‍্য। অবশ‍্য ছেলে বেলা থেকেই দেখেছিভাঙা চোরা।

কে বানিয়েছিলেন , ওখানকার জমিদার যিনি বলতে পারেন নি।তবে চারশো বছরের পুরোনো তো হবেই। কারন ওখানে নাকি সাধক রামপ্রসাদ যে ছাতাটি ব‍্যাবহার করতেন সেটি রাখা আছে। আমি অবশ‍্য কোনদিন দেখিনি। এই মন্দিরের একমাত্র বিশেষত‍্য রথযাত্রা। অন‍্যসময় অনাদরে অবহেলায় পরে থাকে। এক পুরোহিত কুড়ি বছর আগে বেতন পেতেন সারে ছ টাকা। সকালে দুটো ফুল আর বাতাসা সশা, আর সন্ধ্যায় প্রদীপ জেলে দিয়ে আসা, এই ছিলো কাজ। আর জগন্নাথ দেবের লোহার রথ বাইরে রোদে পুরে জলে ভিজে পশ্চিম বঙ্গের সমস্ত প্রাকৃতিক উপদ্রব সহ‍্য করে স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে।

এবার আসি সেই কথায়। ওখানে তখন ফাকা জায়গা।আমার পিশিমার বাড়ি। একদম মন্দিরে লাগোয়া।
বিরাট এক ভাঙা রাজ প্রাসাদ। কত অলিন্দ কত ঘর। বহুবার গেছি । একটু বড়ো হবার পর পিশিমা এসে নিয়ে যেতেন বা পিশতুতো দাদারা কেউ আসতো। দুদিন সেই মধু মাখা দারীদ্রের সঙ্গে থাকতাম।

ওদের বাড়িতে আবার পঞ্চমুন্ডির আসন ছিলো। ওদের কে যেন মা কালির সাধক ছিলেন। যাইহোক , দশ এগারো বছরের আমি সম বয়সী একটা বোন ছিলো। খুব টো টো করে মেলায় ঘুরতাম। কিছু কেনার পয়সা ছিলনা। যেটুকু সবার দয়া দাক্ষিন‍্যে পেয়েছিলাম, জিলিপি আর পাপর খেয়ে উড়িয়ে দিয়েছি।

দুপুরে পিশিমার সঙ্গে যাবো। পিশিমা একটা পঞ্চাশ এ রথ টানা হবে , পিশিমা রথের রশি ধরে দশ পা হাটবেন। প্রচন্ড ভীর ধাক্কা ধাক্কি। পিশিমা ঐ টুকু হেটে বেরিয়ে আসতেন। কিন্তু পিশিমার যে চোখে আধার ঘনিয়ে আসছে কেউ খবর রাখেনি। পাড়ার কয়েকটি ছেলে রশিটা পিশিমার হাতে ধরিয়ে অতিকষ্টে দশপা হাটিয়ে আমার কাছে দিয়ে গেলো। স্বার্থপর আমি ভাবছিলাম ,যা,পিশিমা তো চোখে দেখতে পাচ্ছে না। তাহলে এবার আর কিছুই কিনে দেবে না। কি আর করা। বললাম বাড়ি যাবে তো। পিশিমা হাসলেন। বললেন ওরে বল্ তুই কি কিনবি। মাটির ছোট ছোট হাড়ি কড়াই কিনবোপিশিমা কে নিয়ে এলাম টানতে টানতে সেই দোকানে। কল্পতরু পিশিমা আরো অনেক কিছু কিনে দিলেন। আমার খুব অবাক লাগছিলো। এমন তো হয় না। এবার পিশিমা আমাকে বললেন টাকি দিয়ে জিলিপি আর পাপড় কিনে নিয়ে আয়, আর এখটা ফাকা জায়গায় আমাকে ভসিয়ে রেখে যা। মন্দিরের শিড়ির নিচের ধাপে কোনায় পিশিমা কে বসে য়ে, আমি খাচা ছারা পাখি ফুড়ুৎ করে উড়ে গেলাম নাগর দোলার দিকে। কেউ চড়তে দেয় না। এবার চড়বো।কতক্ষনই বা লাগবে। জিলিপি পাপড় না হয় কম কিনবো। নাগড়দোলায় চড়বো কি, প্রচন্ড ভীড়। না হলোনা। খানিক্ষন হা করে তাকিয়ে দেখে জিলিপি আর পাফড় কিনলাম। ফিরে এসে দেখি পিশিমা , যেখানে বসিয়ে রেখে গিয়েছিলাম সেখানে নেই। এবার কি হবে। একটু একটু অন্ধকার হয়ে আসছে। ভাবলাম বাড়ি গিয়ে দেখে আসি।পরক্ষনেই মনে হলো আমাকে ফেলে পিশিমা কিছু তেই বাড়িতে ফিরবেনা। একটা জায়গায় দেখলাম ঘুরতে ঘুরতে ছোট জটলা। কাছে গিয়ে দেখি প্রতিবেশী নিরা জোর
করে পিশিমার হাত ধরে টানছে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে।তারা নিজেদের মধ‍্যে বলাবলি করছে ,,
ওনার বড়লোক ভাইএর মেয়ে ওনার টাকা নিয়ে এখানে বসিয়েরেখে পালিয়েছে।,,আরো অনেক কিছু।


লজ্জায় অপমানে চোখে জল এসে গেলো। ভীর ঠেলে পিশিমার কাছে গিয়ে একটা জিলিপি পিশিমার মুখে ঢুকিয়ে দিলাম।পিশিমা কাদছিলেন আমি হারিয়ে গেছি ভেবে।আমাকে জ্বরিয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেদে উঠলেন।আমি হাত ধরে বললাম চলো পিশিমা, বাড়ি চলো। নাটক ভেঙে গেল।প্রতিবেশী নিরা মনখ্যৃন‍্য হয়ে চলে গেল।আর আমি পিশিমা কে নিয়ে ফিরে এলাম।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *