পাথরের চাকা

উৎসব-সংস্কৃতি

ঋভু চট্টোপাধ্যায়: গোবরের ঝুড়িটা কাঁকালে নিয়ে হাঁটার সময় ঘাড় ঘুরিয়ে একবার রথটাকে দেখে নেয় কুন্তি বুড়ি।শরীরটার আজকে জুত নাই, বুকটা কেমন যেন করছে।তাও বাইরে আসতে হল। কিছু ক্ষণ দাঁড়িয়ে কি সব ভাবে, তারপর রথটার দিকে এগিয়ে এসে রথের গায়ে ডান হাতটা ঠেকিয়ে প্রণাম করে।সন্ধে নামতে এখনো একটু দেরি আছে।এই সময়ে বুড়ি প্রতিদিন ঝুড়িটা কাঁকালে চাপিয়ে বেরোয়।ঘর ফেরা গরুগুলোর লাদ পাওয়া যায়।সকালেও একবার বেরোয়, তারপর ঘুঁটে দেয় কুন্তি বুড়ি, তাও এখন ঘুঁটের বাজারও নাই।রথের দিকে কয়েকপা এগোতেই পিছনের দিক থেকে মানুষের গলা শুনতে পায়।এই রোদে আবার কে বেরিয়েছে? কুন্তি বুড়ি পিছনের দিকে গিয়ে সুবলাকে দেখতে পায়।তেঁতুল জলে পিতলের রথটাকে মুছছে।বুড়ির ঠোঁটের গোড়ায় হাসি ফুটে ওঠে।রথের গায়ের তেঁতুলের জল পড়লে মনের ভিতরটা কেমন যেন নেচে ওঠে।প্রাইমারি স্কুলে পড়বার সময় থেকেই এটা হয়।স্কুল যাতায়াতের রাস্তাতেই আগে রথটা থাকত পুরানো রাজবাড়ির কাছে।স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখত কত জন বালতি হাতে রথটার নিচ থেকে উপর পর্যন্ত ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছে।চকচক করত রথটা।রথের দিন একটা ট্রাক সামনে, বাঁধা হত।তারপরেও কত জন দড়ি ধরে রথটাকে টানত পুরানো রাজবাড়ি থেকে নতুন রাজবাড়ি।রথের এক্কেবারে উপরে লক্ষণ পণ্ডিতের কোলে থাকত রাজবাড়ির ঠাকুর দামোদর চন্দ্র।স্কুল কয়েকদিন ছুটি থাকত।কুন্তি বুড়ির সেই সব কথা মনে পড়ে যেতেই চোখের কোলটা ভিজে যায়।সুবলকে দেখে অবশ্য মনটা একটু খুশিও হয়, ‘তাহলে কি কাল রথ টানা হবে, মেলা বসবে, তা যদি বসে তবে লোক কই ?’
চারদিকে কি একটা রোগ এসেছে, এই শহরে কারোর হয়েছে বলে না শুনতে পেলেও কয়েকমাস কাজে যেতে সবাই বারণ করেছিল। বর মারা যাবার পর এখন পাঁচরকম করেই নিজের খাবার জোগাড় করে।এখন তো আবার ছেলেটাও নেই।মেয়েটাও আর কোন খোঁজ নেয় না।বরটা এখন কোলিয়ারিতে কাজ পেয়ে তার খুব ডাঁট। কয়েকমাস আগে পাশে টুটুলদের বাড়িতে ফোন করে আবার নাতি হবার খবর দেয়। টুটুলের মুখে শোনে বিটি নাকি বলেছে, ‘মাকে আর ডাকতে হবেক নাই, তুমি বলি দিবে আমার আরকট বেটা হইছে, মা যে কি করে একট ফোন কিনতে লারে।’
কুন্তির এসব কথা শুনে আর কষ্ট হয় না। বিটিটতো সুখে আছে, এটাই শান্তির। একে নিয়েই বুড়ির চিন্তা ছিল। গরিবের ঘর তারপরে আবার লক্ষ্মীর মত দেখতে। ভাগ্যিস নিয়ে চলে গেছিল, না হলে এতদিন…..।
–কি গো পিসি, এদিকে কি খবর? আর মুখে কিছু বাঁধো নাই কেনে? শুনছো নাই সরকার মুখে বাঁইধতে বলিছে।
–আর বাবা, আমার বেঁইধেও যা না বেঁইধেও তা।তুরা আবার রথটকে পানাচ্ছিস কেনে, শুনছিলম ই’বছরকে রথ হবেক নাই?’
-উত বইলতে লারবো, রাজাবাবু মাইজতে বললেক মাজি দিছি।
কুন্তি একপা একপা করে রথের চারদিকটা একবার ঘুরে নেয়।
‘উপরে ওঠার দরজাটা খুব ছোট, এখন আর উঠতে লারবেক, আগে কতবার উপরটতে উঠে বসি থেকিছে।’
কুন্তির চোখের সামনে রাস্তায় ভিড় বাড়ে। ছোট্ট কুন্তি ফর্ক পরে একটা ঝুড়িতে ফুল বেল পাতা নিয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে আর এর ওর কাছে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ও বাবু ফুল দিবে নাই, বেশি টাকা লয় গো, একবার দিন দাও।’ তখন চোখে সেই গল্পের মত রাজকুমারের স্বপ্ন থাকত।
কুন্তির আবার চোখের কোণ ভিজে যায়, আর দাঁড়াতে পারে না।
এই রথ মোছা নিয়ে একবার এখানে গ্রামের লোকের সাথে বড়রাজাবাবুর ঝামেলা হয়ে ছিল। কুন্তি তখন বেশ বড়, বেশ কয়েকঘরে বাসন মাজে। তাদের মুখে শুনেছিল। রথ মাজতে এক মুসলিম উপরে উঠেছিল, তাতেই ঝামেলা। শেষকালে বড়রাজাবাবুই সব কিছু মিটিয়ে ছিলেন। মানুষটাকে কুন্তি কোন দিন না দেখলেও শুনেছে তিনি গরিবদের কথা শুনতেন তাদের ভালো মন্দ দেখতেন, সেটা জমিদারি চলে যাওয়ার পরেও।
কুন্তি একপা একপা করে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।কালকে রথ কিন্তু কুনু জোগাড় নাই।অন্য বছর হলে মাঠে সার্কাস, নাগরদোলা, আর দোকান বসে যেত। কত রকমের দোকান।ময়রাদের দোকানগুলো বাইরে আবার প্যাণ্ডেল করত। গরম গরম বালুসাই, জিলাপি, গজা কত কিছু বিক্রি হত। রথে সব ঘর থেকে টাকা দিত। কুন্তির মা আবার সে টাকাগুলো নিত না।কুন্তি সব টাকা জমিয়ে ভাঙা মেলাতে চুড়ি, ফিতে, কানের কিনত। বিয়ের পরেও এই শখটা যায় নি।তবে বেশি দিন পরতে পারল কই, বছর দশের মধ্যেই সব শেষ। পাওয়া টাকাগুলো ছেলে মেয়েদের হাতে তুলে দিত। ছেলেটা ভালো ছিল, খরচ করত না। রথ পেরোলেই আবার ফেরত দিয়ে বলত,‘এ’মা এটা রাখ, আমি কিছু কিনি নাই, তুই লিয়ে লে।’
ছেলেটাই কুন্তির কথা ভাবত। বলত,‘আমি ভালো করে ড্রাইভারিটা শিখে লি আর তুকে বাসন মাজতে হবেক লাই।’ ট্রাকের খালাসির কাজ করত। কি যে হল শুনল মারা গেছে। কুন্তি শেষ দেখাটাও দেখতে পায় নি। কয়েকমাস পরে পুলিশ এসে একটা ছোট ব্যাগ দিয়ে যায়। কুন্তি আজও ব্যাগটা খুলে দেখে নি।
আরো কয়েকপা চলার পর আবার দাঁড়িয়ে পড়ল কুন্তি।একি সেই সঙের ভিখারিগুলো চলে এসেছে যে! ওরা কি কিছু খবর পায় নি? ছোটতে এদের দেখে খুব ভয় লাগত। সারা গায়ে দগদগে ঘা, হাতে পায়ে কাটা দাগ। মুখ দিয়ে গোঙানোর আওয়াজ, সব মিলিয়ে একটা অন্য রকমের ব্যাপার।একটু বড় হবার পর কুন্তি বুঝল বেশির ভাগের কিছুই হয় না। সবাই এমন ভাবে সাজে, ভান করে।একটা লোকের সাথে আলাপও হয়েছিল। সেটা কুন্তির বর প্রফুল্ল মারা যাবার কয়েক বছর পরের ঘটনা।কুন্তি তখনও রথের মেলায় সকালে ফুল, মালা আর বিকালের দিকে পাঁপড় বিক্রি করত।তার মাঝে কয়েকঘর বাসন মাজা ছিল। একটু রাতের দিকে সব কিছু গোছাচ্ছিল এমন সময় কাঠের গাড়িতে শুয়ে থাকা একটা লোককে টানতে টানতে আরেকজন এল।ও বাবা! অন্ধকারের দিকে গিয়ে কুন্তির চোখের সামনে শুয়ে থাকা লোকটা বেমালুম উঠে পড়ল।কুন্তির অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা দেখে লোকটা তার কাছে এসে বসে।একট পাঁপড় তুলে কয়েকটা কথার ফাঁকে বলে,‘সামনে বছর থেকে তুমিও শুয়ে যাও। আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো।’


কুন্তি সব শুনলেও খারাপ লাগে।এ’গাঁয়ের মেয়ে, এগাঁয়েরই বউ আর এখানেই এমন করবে ?
কিছু উত্তর দেয় না।
মনটা ভালো নেই।এত ভিড় এত মানুষ, এবছর কিছুই থাকবে না।
কুন্তির ঝুড়ি অর্ধেক ভর্তি না হলেও এখানে থাকতে ইচ্ছে করে না, শরীরটার জুত নাই।
ঘরে ঢুকেই ছেলের ছবিটা বের করে। আঁচল দিয়ে মুছে নেয়। অন্ধকার চারদিকটা ঘিরে ধরে। কুন্তির আর ভাত চাপাতে ইচ্ছে করে না। শরীরটাতে কেমন যেন কষ্ট হয়। হাত পা মাথা বুক সব জায়গায় কেমন যেন হয়। কুন্তি শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ হয়ে যেতেই একটা রথ থেকে রাজকুমার নেমে কুন্তির হাত ধরে। কুন্তি তখন ফর্ক পরে থাকে। লজ্জায় হাত ধরতে পারে না। সবাই দেখে ফেলবে যে।

পরের দিন রথ না হলেও প্রতিবছরের মত লক্ষণ পণ্ডিতের ছেলে গনেশের কোলে রাজবাড়ির ঠাকুর দামোদর চন্দ্র রথে ওঠেন।গাঁয়ের কাউকে পুলিশ রথের কাছে যেতে দেয় না।কিন্তু কুন্তির বাড়ির সামনে লোক জড়ো হয়। অনেক বেলা পর্যন্ত দরজা না খোলা দেখে দরজা ভাঙে তারপর ওরাই সব ব্যবস্থা করে।এবছর রথের চাকা না নড়লেও কুন্তিকে রথটার পাশ দিয়েই যেতে হবে।শেষ বারের মত রথটাকে তো দেখতে পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *