রথযাত্রার মাহাত্ম্য কী, কেনই বা বছরে একবার রথে চাপেন প্রভু?

খবর

পবিত্র চক্রবর্তী: আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে এমন কিছু নেই যা আপনারা নেটের দৌলতে অধিকাংশই জেনে গেছেন। তাহলে লিখতে গেলাম কেন এই আলেখ্য? আছে তারও উত্তর আছে একদম শেষে। তবে এ প্রতিবেদনে হয়তো পেতেও পারেন নতুন কিছু।

সারা বছর পুরীর মন্দিরে জগন্নাথদেব পূজিত হলেও সেখানে সকলের প্রবেশাধিকার ছিল না। তাই আপামর জনসাধারণ যাতে জগন্নাথ দেব দর্শন করতে পায় সে জন্যই এই রথযাত্রা — জগন্নাথের গুণ্ডিচা যাত্রা।
সূত সংহিতায় আছে-

– ‘রথে তু বামনং দৃষ্ট্বা, পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।’

তাই ধর্মভীরু হিন্দুরা সহজে পুণ্যার্জনের জন্য রথের রশি একটু ছুঁতে পাগল হয়ে ওঠে।

কপিল সংহিতায় উল্লেখ আছে —

”গুণ্ডিচাখ্যং মহাযাত্রা যে পশ্যন্তি মুদনিতাঃ/সর্বপাপ বিনির্মুক্তাস্তে যান্তি ভুবনং মম।”

অর্থাৎ ‘গুণ্ডিচা যাত্রায় যে ব্যক্তি আমায় দর্শন করবে সে কালক্রমে সব পাপ থেকে মুক্ত হয়ে আমার (জগন্নাথ দেবের), ভুবনে যাবে। ‘ আর এর জন্যই আজও রথযাত্রার দিন ছোট ছোট শিশুরা রাস্তায় যে রথ নিয়ে বের হয় তার রশি একটু টানতে বা স্পর্শ করতে দেখা যায় পথচলতি লোকেদের অনেককেই।

সংস্কৃত ভাষায় রথ মানে গাড়ী এবং যাত্রা মানে মিছিল।ক্ষনিকের জন্য জগন্নাথদেবকে রথের উপর দর্শন করাকে বহু পূণ্য কর্মের ফল হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

রথ সম্বন্ধে কঠ উপনিষদে বলা হয়েছে- রথ হচ্ছে শরীর, রথের মধ্যে স্থাপিত বিগ্রহ হচ্ছে আত্মাস্বরুপ এবং জ্ঞান যাহা মনকে নিয়ন্ত্রন করে, রথের চালক স্বরূপ।

রথযাত্রা আর্যজাতির একটি প্রাচীন ধর্মোৎসব। কিন্তু এখন রথযাত্রা বললে সাধারণত জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই বোঝায়। কিন্তু একসময় ভারতবর্ষে সৌর, শক্তি, শৈব, বৈষ্ণব, জৈন, বৌদ্ধ সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে স্ব স্ব উপাস্যদেবের উৎসববিশেষে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হতো।

প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ এবং পদ্মপুরাণে রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথ কেমন হবে, সে সম্পর্কে বলা আছে। বিষ্ণুধর্মোত্তরে একই রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা—এই তিনটি মূর্তি স্থাপন নির্দেশ থাকলেও পুরুষোত্তম মাহাতো ও নীলাদ্রি মহোদয়ের পদ্ধতি অনুসারে পুরীধামে আজ পর্যন্ততিনজনের জন্য তিনটি বৃহৎ রথ প্রস্তুত হয়ে থাকে।

উৎকলখণ্ড এবং দেউলতোলা নামক ওডিশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, সত্যযুগে অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্র নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্র পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।

বৌদ্ধযুগেও জগন্নাথদেবের রথযাত্রার অনুরূপ রথে বুদ্ধদেবের মূর্তি স্থাপন করে রথযাত্রার প্রচলন ছিল। বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা হিয়ান খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতকে তৎকালীন মধ্য এশিয়ার খোটানে স্থানে, যে বুদ্ধ রথযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন, তা অনেকাংশে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ত্রিশ ফুট উঁচু চার চাকার একটি রথকে বিভিন্ন রত্ন, অলংকার ও বস্ত্রে সুন্দরভাবে সাজানো হতো। রথটির চারপাশে থাকত নানা দেবদেবীর মূর্তি। মাঝখানে স্থাপন করা হতো বুদ্ধদেবের মূর্তি। এরপর সে দেশের রাজা তাঁর মুকুট খুলে রেখে খালি পায়ে রথের সামনে এসে নতমস্তকে বুদ্ধদেবের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার পর মহাসমারোহে রথযাত্রা শুরু হতো।


প্রভু জগন্নাথদেবের রথের নাম (নন্দি ঘোষ) এই রথটি দেবরাজ ইন্দ্র শ্রীজগন্নাথদেবকে প্রদান করে।

রথের উচ্চা ৩৩.হাত ১ আঙ্গুল,,,
এই রথ ৮৩২ টি কাঠদ্বারা তৈরি,
এই রথের ১৬,টি চাকা,,
চাকার উচ্চতা ৭ ফুট, চৌড়া ৭ ইন্চি,,,

রথের রক্ষক হচ্ছেন গরুর,,
রথের ধজ্বায় হুনুমান বিরাজিত,,,
রথের রঙ লাল ও পিক্ত,,,
রথের ৯ জন দেবতা অধিষ্ঠিত,

রথের ৪ টি অর্শ/গোড়া,তাদের নাম
বরাহ,শংঙ্খ,সেতু ও হরিদাস,,
রথের সারতীর নাম দ্বারুজ,,,
রথের দ্বারপাল জয়, বিজয়,,,

রথের রজ্জুর নাম শঙ্খচুড়,,,,
রথের নেত্রের নাম তৈল্ক্ষ মোহিনি,,
রথের উধিশ্বর প্রভু জগন্নাথ,,

– জগন্নাথ দেবের রথের প্রতিটি অংশই অতি পবিত্র, কারণ তিনটি রথেই বিরাজ করেন তেত্রিশ কোটি দেবতা। তাই এই রথের রশি একটু স্পর্শ করা বা টানা মানে এই তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর চরণ স্পর্শ করা। যাই হোক, রথ তিনটির চাকার ব্যাস সাত ফুট। প্রতি রথেই ৩৪টি অংশ — চাকা, আরা, ডাণ্ডিয়া, বেকি, হংসপট, কানি, শঙ্খদ্বার, জালি, গইপট, সিংহাসন, রুশিপট ইত্যাদি। রথের চূড়ায় কলস ও সুদর্শন চক্র এবং সবার উপরে ধ্বজা। কয়েক টন ওজনের এই রথ তিনটি টানতে যে খুব শক্তপোক্ত রশি বা দৌড়ি (ওড়িয়া ভাষায়) লাগে তাতে সন্দেহ নেই। তবে এই রশি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কেরল থেকে আসত। আর এখন উড়িষ্যা কয়ার বোর্ড এই দড়ি তৈরি করে দেয়।

বলভদ্রের রথের নাম: তালধ্বজ

সুভদ্রার রথের নাম: দেবদলন

জগন্নাথের রথের নাম: নন্দিঘোষ

এ বছর মহামারি আমাদের জীবনের সব হিসাবনিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে। তবুও রথ হল দেহেরই আরেক নাম, সে থামে কী করে ? পুরীর নীলাকাশের তোলে আগামী ২৩ জুন ২০২০ আসবে হাতির দল, সমাগম হবে প্রায় পাঁচ হাজার সেবায়তের। বিপুলকায় ত্রি রথের রজ্জু অর্থাৎ বাসুকির লেজে টান মেরে নিয়ে যাওয়া হবে পরম দেব সহ বলরাম এবং শুভদ্রা রাণীকে মাসির বাড়ীর। নানা আলোচনার পর পুরী মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং উড়িষ্যা সরকার আপাতত এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *